দেশের বাজারে ভোজ্য তেলের দাম কমেছে চট্টগ্রামের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে ভোজ্যতেলের দাম কমতে শুরু করেছে। সপ্তাহের ব্যবধানে সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম প্রতি মণে কমেছে ১০০ থেকে ১৩০ টাকা। তবে বোতলজাত সয়াবিন তেল সরবরাহে ঘাটতি থাকায় চাহিদা মতো তেল পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সব ধরনের ভোজ্যতেলের দাম কমছে। এর প্রভাবেই দেশে তেলের দাম কমছে।
গতকাল মঙ্গলবার খাতুনগঞ্জে প্রতি মণ (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) সয়াবিন তেল বিক্রি হয় ৭ হাজার ৩৭০ টাকায়। এ দাম এক সপ্তাহ আগে ছিল ৭ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে দাম কমেছে মণে ১৩০ টাকা। একই সময়ে পাম অয়েলের মণ ছিল ৬ হাজার ৫০০ টাকা। এ দর আগের সপ্তাহে ৩০০ টাকা বেড়ে ঠেকে ৬ হাজার ৬০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিমণে পাম অয়েলের কমেছে ১০০ টাকা। এছাড়া সুপার পাম অয়েল গতকাল মণপ্রতি ৬ হাজার ৮২৫ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৬ হাজার ৮০০ টাকা। অন্যদিকে খুচরায় প্রতি কেজি খোলা সয়াবিন ২০৮ থেকে ২০৯ টাকা, পাম অয়েল ১৭৫ থেকে ১৭৮ এবং সুপার পাম অয়েল ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি পিংকশিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের গড় দাম ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ১৫৪ ডলার। জুলাই-সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৩৭ ডলারে। দাম আরও বেড়ে গত জুনে টনপ্রতি ১ হাজার ৭৪০ ডলারে ওঠে, যা গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরের গড়ের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ বেশি। কিছুটা কমলেও দাম এখনও গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি। জুলাইয়ে টনপ্রতি দাম ছিল ১ হাজার ৬৫৮ ডলার, আগস্টে ১ হাজার ৬৩৮ এবং সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৫৫০ থেকে ১ হাজার ৬০০ ডলার। অর্থাৎ জুনের তুলনায় দাম কমলেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এখনও প্রায় ২৫ থেকে ২৯ শতাংশ বেশি।
আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, মালয়েশিয়া ডেরিভেটিভস এক্সচেঞ্জে ডিসেম্বরে সরবরাহ চুক্তিতে পাম অয়েলের দাম টনপ্রতি ৩৮ রিঙ্গিত বা দশমিক ৭৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৯৮ রিঙ্গিতে। ডলারের হিসাবে যা প্রায় ১ হাজার ২০০ ডলার ৪৯ সেন্ট। তবে সপ্তাহজুড়ে চুক্তিটির দাম ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেড়েছে। পাকিস্তানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিজনেস রেকর্ডার সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য ভোজ্যতেলের দাম কমে যাওয়ায় মালয়েশিয়ায় পাম অয়েলের দাম কমেছে। তবে সপ্তাহের হিসাবে দাম বেড়েছে। অপরদিকে চীনের দালিয়ান কমোডিটি এক্সচেঞ্জে সয়াবিন তেলের চুক্তির দাম ১ দশমিক ৫৭ শতাংশ কমেছে। একই বাজারে পাম অয়েলের দাম কমেছে ২ দশমিক ১৪ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে সয়াবিন তেলের দামও দশমিক ৭৭ শতাংশ কমেছে।
খাতুনগঞ্জ আড়ৎদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন রূপান্তরকে বলেন, সপ্তাহের ব্যবধানে পাম অয়েলের দাম প্রতিটনে ১০০ টাকা কমেছে। একই অবস্থা সয়াবিন তেলেরও। তবে এর আগে সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম অনেক বেড়েছিল। আর সামনে শীত মৌসুম আসছে। ফলে এ সময়ে পাম অয়েলের দাম একটু বেশি থাকবে। এছাড়া জ্বালানি তেলের দাম লিটারের ২০ টাকা বাড়ানোর প্রভাবে এখন ভোজ্যতেলের বাজারের পড়েনি।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, চাহিদা অনুপাতে তেল সরবরাহ কম। এর প্রভাব পড়ছে পাইকারি ও খুচরা বাজারে। বিশেষ করে এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিনের সংকট রয়েছে। পাঁচ লিটারের বোতলজাত ভোজ্যতেল পাওয়া যাচ্ছে। সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে কোথাও কোথাও মোড়কে লেখা দামের চেয়ে বেশি টাকায় বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। সরকার ভোজ্যতেলের বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করলেও উল্টো প্রভাব পড়ছে সরবরাহে।
দেশের একটি ভোজ্যতেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের তথ্যানুসারে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরের তুলনায় এখন প্রায় ২৫ শতাংশের বেশি। সরকারি নীতি অনুযায়ী প্রতি মাসে ভোজ্যতেলের দাম পুনর্নির্ধারণের কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির কথা জানিয়ে কয়েক দফায় দেশে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছেন মিল মালিক ও আমদানিকারকরা। বিপরীতে চলতি বছর দেশের বাজারে দুই দফায় দাম বাড়ানো হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি। প্রথম দফায় ২৯ এপ্রিল প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৫ থেকে ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়। একই সময়ে পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৯৫৫ থেকে বাড়িয়ে ৯৭৫ এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৮০ টাকা করা হয়। এরপর গত ২ সেপ্টেম্বর আবারও দাম সমন্বয় করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিনের দাম ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা, পাঁচ লিটারের দাম ২৫ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা এবং খোলা সয়াবিনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়িয়ে ১৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক একজন সভাপতি রূপান্তরকে বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে আমদানি করা সয়াবিন তেলের কস্টিং লিটারপ্রতি ২১০ টাকায় উঠলেও রমজানে ভোক্তার ওপর চাপ না বাড়াতে সরকারের অনুরোধে তখন দাম সমন্বয় করা হয়নি। রমজানের পর ২৯ এপ্রিল লিটারপ্রতি ৪ টাকা দাম বাড়ানো হয়। অল্প সময়ের মধ্যে মূল্য সমন্বয়ের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা হয়নি। পরের তিন মাসে সয়াবিন তেলের কস্টিং লিটারপ্রতি ২১৭ টাকায় উঠলেও বিক্রয়মূল্য ছিল ১৯৯ টাকা। এতে লিটারপ্রতি প্রায় ১৮ টাকা লোকসান হয়েছিল। পরে সেপ্টেম্বরের শুরুতে লিটারে ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এখনও আমাদের লিটারের ১০ টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস দিয়ে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এইচএস কোডে মোট ৬৫ হাজার ৯৫৬ টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে পাম তেল ৫০ হাজার ৮৯৬ টন, যা মোট আমদানির প্রায় ৭৭ দশমিক ১ শতাংশ। আর সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে ১৫ হাজার ৬১ টন, যা মোট আমদানির প্রায় ২২ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ সয়াবিন তেলের তুলনায় পাম তেল আমদানি হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৪ গুণ বেশি।

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন