ঢাকা কাস্টম হাউসের উপকমিশনার মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকি, জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে পণ্য খালাস, চোরাচালানে সহায়তা ও অবৈধ অর্থ গ্রহণসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগে উত্থাপিত তথ্যের স্বাধীন সত্যতা এখনও যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
চাকরিজীবন
৩১তম বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী কমিশনার হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন আমিনুল ইসলাম। পরে তিনি কাস্টম হাউস চট্টগ্রাম ও ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেটসহ রাজস্ব প্রশাসনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা কাস্টম হাউসের উপকমিশনার হিসেবে কর্মরত। অভিযোগকারীর দাবি, চাকরিজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল।
ভুয়া কাগজপত্রে পণ্য খালাসের অভিযোগ
অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনুযায়ী, বন্ধ হয়ে যাওয়া তিনটি বন্ড প্রতিষ্ঠান—Alien Apparels Ltd, Uranus Apparels (Pvt.) Ltd ও Quick Apparels Limited—এর নামে ভুয়া ইউজার ডিক্লারেশন ব্যবহার করে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য খালাস করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত বন্ধ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তাদের নামে এই সুবিধা মিলল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী। এতে কাস্টমসের প্রিভেন্টিভ শাখার এক কর্মকর্তা, কমিশনারের একজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও আরেকজন রাজস্ব কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
চোরাচালানে সহায়তার অভিযোগ
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, 'সরকার হানিফ' নামে পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে চোরাচালান ও অবৈধ পণ্য খালাসে সহযোগিতা করেছেন আমিনুল ইসলাম। হানিফ ও শরিফ নামে আরও দুই ব্যক্তির সঙ্গেও তার সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়েছে অভিযোগে। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো প্রকাশ্য নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিএসটিআই ছাড়পত্র ছাড়াই পণ্য খালাস, সাপ্তাহিক ঘুষের অভিযোগ
শিশু খাদ্য ও প্রসাধনীর মতো যেসব পণ্যে বিএসটিআইয়ের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক, সেসব পণ্যও প্রভাব খাটিয়ে ছাড়পত্র ছাড়া খালাস করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। এর বিনিময়ে আমিনুল ইসলাম সাপ্তাহিক প্রায় ৮০ লাখ টাকা অবৈধভাবে গ্রহণ করেন বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এ বিপুল অঙ্কের লেনদেনের সমর্থনে কোনো ব্যাংক হিসাব, রেকর্ড বা অন্য প্রমাণ অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি।
'ক্লোজেট ক্লাউড' নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগে 'Closet Cloud' নামের একটি প্রতিষ্ঠান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যার বিআইএন ০০৪৬৩৬২৪৪-০১০১ ও টিআইএন ৩৮৩৬৩৭১৪৬৬০৪ বলে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগকারীর দাবি, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আমিনুল ইসলামের এক নিকটাত্মীয়ের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এবং মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে পণ্য আমদানি করে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী সাবিহা জাহানের সঙ্গে আমিনুল ইসলামের পরিবারের কোনো ব্যবসায়িক বা আর্থিক সম্পর্ক আছে কি না, তা-ও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
সাবেক এনবিআর সদস্যের নাম
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদ্য সাবেক সদস্য মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের প্রভাব ব্যবহার করে ঢাকা কাস্টম হাউসে অনিয়মে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও তোলা হয়েছে। এ বিষয়েও স্বাধীন কোনো প্রমাণ এখনো যাচাই করা যায়নি।
আয়-সম্পদে অসামঞ্জস্যের অভিযোগ
আমিনুল ইসলামের আয়কর নথি নম্বর ৭৮৬১৬৩৯৫৭২৪৭ উল্লেখ করে অভিযোগে বলা হয়েছে, তার ঘোষিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে প্রকৃত জীবনযাপনের ধরনে অসামঞ্জস্য থাকতে পারে। এ জন্য আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদ যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযুক্তের বক্তব্য মেলেনি
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপকমিশনার মো. আমিনুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এই প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
একজন দায়িত্বশীল কাস্টমস কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এতগুলো গুরুতর অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে তা স্পষ্ট করার দাবিও উঠেছে।

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন