ঢাকা   রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক রুপান্তর

রেলওয়েতে বহিরাগত মাহবুবের অবাধ বিচরণ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

রেলওয়েতে বহিরাগত মাহবুবের অবাধ বিচরণ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন দপ্তরে এক বহিরাগত ব্যক্তির অবাধ যাতায়াত, কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত নথি সংগ্রহ, অভিযোগ দাখিল এবং নিজেকে “সিনিয়র আয়কর আইনজীবী” পরিচয়ে পরিচিত করার বিষয়টি নিয়ে রেল অঙ্গনে নানা আলোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম মো. মাহবুবুর রহমান ওরফে “টয়লেট মাহবুব”। যদিও তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নন, তবুও দীর্ঘদিন ধরে তাকে রেলওয়ের বিভিন্ন দপ্তরে নিয়মিত যাতায়াত করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

রেলওয়ের একাধিক সূত্রের দাবি, “টয়লেট মাহবুব” খ্যাত ব্যাক্তি বিভিন্ন দপ্তরের অফিস সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটরদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে কর্মকর্তাদের নথি সংগ্রহ করেন এবং পরবর্তীতে সেই তথ্য ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করেন। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমে তথ্য সরবরাহ করে কর্মকর্তাদের হয়রানির চেষ্টা করেন।

এর আগে চট্টগ্রাম রেলওয়ে ষ্টেশনের পাবলিক টয়লেটের ইজারা নিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ নিয়ে কয়েকটি গণমাধ্যমে “টয়লেট মাহবুব” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হলেও এখনো দৌরাত্ম কমেনি তার।

জানা গেছে, মাহবুবুর রহমানের স্ত্রী মাকসুদা আক্তার লিখি বাংলাদেশ রেলওয়ের একজন কর্মী। অভিযোগ রয়েছে, তার স্ত্রীর সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরোধ বা বাকবিতণ্ডা হলে সেই ঘটনার সূত্র ধরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপনের প্রক্রিয়া করেন। এমন বেশ কয়েকটি অভিযোগের কাগজপত্র সংরক্ষিত রয়েছে প্রতিবেদকের কাছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ পার্সোনাল অফিসারের (সিপিও) দপ্তর থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায়ও মাহবুবুর রহমানের নাম আলোচনায় এসেছে। সিপিও দপ্তরের এক কর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, নথিটি মূলত মাহবুবুর রহমান ও তার স্ত্রীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্ত ও যাচাই-বাছাই শেষে প্রস্তুত করা হয়েছিল। অভিযোগকারী পক্ষের উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্তে সত্যতা না পাওয়ার পর নথিটি নিখোঁজ হয়। সিপিও তরুন কান্তি বালার সামনেই মাহবুবুর রহমান নথিটি নিয়ে যান বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে সিপিও তরুন কান্তি বালা বলেন, নথির বিষয়ে কি বলবো কয়েকদিন আগে আমার ব্যাক্তিগত ফাইলটি চুরি হয়েছে। জানিনা কারা এসব করে এবং তাদের স্বার্থটা বা কি। সময় থাকতে নিজেকে শুধরে না নিলে প্রকৃতি থেকেই বিচার হয়ে আসবে। কেউ যদি কারো সাথে অন্যায় করে তবে তার শাস্তি অনিবার্য আজ নয়তো কাল।

জানতে চাইলে ভুক্তভোগী রেলওয়ে কর্মকর্তা আদালত পরিদর্শক (গ্রেড-১) জিনিয়া নাসরিন বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির প্রত্যয়নপত্র, প্রশাসনের যাচাই-বাছাই এবং ব্যারিস্টারের আইনগত মতামত—সবকিছুতেই প্রমাণ হয়েছে আমি কোনো দ্বৈত পেশায় জড়িত নই এবং সরকারি চাকরি বিধিও লঙ্ঘন করিনি। এসব সত্য প্রকাশ পাওয়ার পরই অলৌকিকভাবে পুরো নথিটি গায়েব হয়ে গেছে। আমার বিশ্বাস, সঠিক তথ্য গোপন করতেই নথিটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

জানা যায়, বহিরাগত হওয়া সত্ত্বেও মাহবুবুর রহমান মহাব্যাবস্থাপক (জিএম) কার্যালয়সহ রেলওয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে নিয়মিত যাতায়াত করেন এবং বিভিন্ন নথিপত্র বিভিন্ন পর্যায়ে উপস্থাপন বা স্বাক্ষর করানোর কাজেও যুক্ত রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সচেতন মহলের প্রশ্ন—একজন বহিরাগত ব্যক্তি কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে অবাধে প্রবেশ করছেন এবং কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, মাহবুবুর রহমান নিজের নামের সঙ্গে “সিনিয়র আয়কর আইনজীবী” পরিচয় ব্যবহার করে একটি ব্যক্তিগত প্যাড তৈরি করেছেন, যেখানে বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি ও প্রশাসনিক বিষয়ে সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদকের কাছে এ ধরনের কিছু নথি ও প্যাডের অনুলিপি রয়েছে।

সূত্র জানায়, মাহবুবুর রহমান বিভিন্ন সময় ঠিকাদারি কাজের উদ্দেশ্যে রেলওয়ের বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, যে দপ্তরে কাজের সম্ভাবনা থাকে, সেই দপ্তরের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে পরবর্তীতে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কাজ আদায়ের চেষ্টা করা হয়। এমনকি কাজ পাওয়ার পর অন্য ঠিকাদারের কাছে তা হস্তান্তরের অভিযোগও রয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের এক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মাহবুবুর রহমানকে অনেক কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন না। কিন্তু বিভিন্ন বিতর্ক ও অযাচিত পরিস্থিতি এড়াতে অনেক সময় তার সঙ্গে কথা বলতে হয়। রেলওয়ের সঙ্গে তার কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই—এটি সবাই জানেন।”

জানা যায়, মাহবুবুর রহমান একসময় বাংলাদেশ রেলওয়ে ঋণদান সমবায় সমিতিতে চাকরি করতেন। অভিযোগ রয়েছে, স্বাক্ষর জালিয়াতির ঘটনায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম নগরীর নিমতলা উচ্চ বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে অস্থায়ীভাবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে মেকি সীলমোহর ব্যবহার, হিসাব বিকৃতকরণ ও জাল নথিপত্র ব্যবহারের মাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগে তার বিরুদ্ধে সরকার বাদী একটি মামলা করা হয় বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকও ব্যক্তিগতভাবে তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন বলে জানা যায়।

ওই মামলাগুলোর একটিতে মাহবুবুর রহমান দীর্ঘ ছয় মাস কারাগারে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে এসব মামলার বিচারিক কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে।

তবে, মাহবুবুর রহমানের মুঠোফোন একাধিকবার কল করেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।

নিজেকে “সিনিয়র আয়কর আইনজীবী” হিসেবে পরিচয় দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০১৭ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) আয়কর পেশাজীবী (আইটিপি) হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তবে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আইনজীবী তালিকায় তার নাম পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত না হয়ে কেউ নিজেকে “অ্যাডভোকেট” বা “আইনজীবী” হিসেবে পরিচয় দিতে পারেন না। আর “সিনিয়র” বিশেষণ ব্যবহার করতে হলে নির্দিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া ও দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়।

আইনজীবীরা বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি যথাযথ যোগ্যতা ছাড়া নিজেকে “সিনিয়র আয়কর আইনজীবী” হিসেবে পরিচয় দেন, তাহলে তা বিভ্রান্তিকর ও প্রতারণামূলক হতে পারে। এ ধরনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি প্রয়োজন বলেও তারা মত দেন।

রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বহিরাগত ব্যক্তিদের অবাধ যাতায়াত, নথির নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক রুপান্তর

রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬


রেলওয়েতে বহিরাগত মাহবুবের অবাধ বিচরণ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬

featured Image
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন দপ্তরে এক বহিরাগত ব্যক্তির অবাধ যাতায়াত, কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত নথি সংগ্রহ, অভিযোগ দাখিল এবং নিজেকে “সিনিয়র আয়কর আইনজীবী” পরিচয়ে পরিচিত করার বিষয়টি নিয়ে রেল অঙ্গনে নানা আলোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম মো. মাহবুবুর রহমান ওরফে “টয়লেট মাহবুব”। যদিও তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নন, তবুও দীর্ঘদিন ধরে তাকে রেলওয়ের বিভিন্ন দপ্তরে নিয়মিত যাতায়াত করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।রেলওয়ের একাধিক সূত্রের দাবি, “টয়লেট মাহবুব” খ্যাত ব্যাক্তি বিভিন্ন দপ্তরের অফিস সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটরদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে কর্মকর্তাদের নথি সংগ্রহ করেন এবং পরবর্তীতে সেই তথ্য ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করেন। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমে তথ্য সরবরাহ করে কর্মকর্তাদের হয়রানির চেষ্টা করেন।এর আগে চট্টগ্রাম রেলওয়ে ষ্টেশনের পাবলিক টয়লেটের ইজারা নিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ নিয়ে কয়েকটি গণমাধ্যমে “টয়লেট মাহবুব” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হলেও এখনো দৌরাত্ম কমেনি তার।জানা গেছে, মাহবুবুর রহমানের স্ত্রী মাকসুদা আক্তার লিখি বাংলাদেশ রেলওয়ের একজন কর্মী। অভিযোগ রয়েছে, তার স্ত্রীর সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরোধ বা বাকবিতণ্ডা হলে সেই ঘটনার সূত্র ধরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপনের প্রক্রিয়া করেন। এমন বেশ কয়েকটি অভিযোগের কাগজপত্র সংরক্ষিত রয়েছে প্রতিবেদকের কাছে।সম্প্রতি বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ পার্সোনাল অফিসারের (সিপিও) দপ্তর থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায়ও মাহবুবুর রহমানের নাম আলোচনায় এসেছে। সিপিও দপ্তরের এক কর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, নথিটি মূলত মাহবুবুর রহমান ও তার স্ত্রীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্ত ও যাচাই-বাছাই শেষে প্রস্তুত করা হয়েছিল। অভিযোগকারী পক্ষের উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্তে সত্যতা না পাওয়ার পর নথিটি নিখোঁজ হয়। সিপিও তরুন কান্তি বালার সামনেই মাহবুবুর রহমান নথিটি নিয়ে যান বলে জানান তিনি।এ বিষয়ে সিপিও তরুন কান্তি বালা বলেন, নথির বিষয়ে কি বলবো কয়েকদিন আগে আমার ব্যাক্তিগত ফাইলটি চুরি হয়েছে। জানিনা কারা এসব করে এবং তাদের স্বার্থটা বা কি। সময় থাকতে নিজেকে শুধরে না নিলে প্রকৃতি থেকেই বিচার হয়ে আসবে। কেউ যদি কারো সাথে অন্যায় করে তবে তার শাস্তি অনিবার্য আজ নয়তো কাল।জানতে চাইলে ভুক্তভোগী রেলওয়ে কর্মকর্তা আদালত পরিদর্শক (গ্রেড-১) জিনিয়া নাসরিন বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির প্রত্যয়নপত্র, প্রশাসনের যাচাই-বাছাই এবং ব্যারিস্টারের আইনগত মতামত—সবকিছুতেই প্রমাণ হয়েছে আমি কোনো দ্বৈত পেশায় জড়িত নই এবং সরকারি চাকরি বিধিও লঙ্ঘন করিনি। এসব সত্য প্রকাশ পাওয়ার পরই অলৌকিকভাবে পুরো নথিটি গায়েব হয়ে গেছে। আমার বিশ্বাস, সঠিক তথ্য গোপন করতেই নথিটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।জানা যায়, বহিরাগত হওয়া সত্ত্বেও মাহবুবুর রহমান মহাব্যাবস্থাপক (জিএম) কার্যালয়সহ রেলওয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে নিয়মিত যাতায়াত করেন এবং বিভিন্ন নথিপত্র বিভিন্ন পর্যায়ে উপস্থাপন বা স্বাক্ষর করানোর কাজেও যুক্ত রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সচেতন মহলের প্রশ্ন—একজন বহিরাগত ব্যক্তি কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে অবাধে প্রবেশ করছেন এবং কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করছেন।অভিযোগ রয়েছে, মাহবুবুর রহমান নিজের নামের সঙ্গে “সিনিয়র আয়কর আইনজীবী” পরিচয় ব্যবহার করে একটি ব্যক্তিগত প্যাড তৈরি করেছেন, যেখানে বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি ও প্রশাসনিক বিষয়ে সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদকের কাছে এ ধরনের কিছু নথি ও প্যাডের অনুলিপি রয়েছে।সূত্র জানায়, মাহবুবুর রহমান বিভিন্ন সময় ঠিকাদারি কাজের উদ্দেশ্যে রেলওয়ের বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, যে দপ্তরে কাজের সম্ভাবনা থাকে, সেই দপ্তরের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে পরবর্তীতে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কাজ আদায়ের চেষ্টা করা হয়। এমনকি কাজ পাওয়ার পর অন্য ঠিকাদারের কাছে তা হস্তান্তরের অভিযোগও রয়েছে।বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের এক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মাহবুবুর রহমানকে অনেক কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন না। কিন্তু বিভিন্ন বিতর্ক ও অযাচিত পরিস্থিতি এড়াতে অনেক সময় তার সঙ্গে কথা বলতে হয়। রেলওয়ের সঙ্গে তার কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই—এটি সবাই জানেন।”জানা যায়, মাহবুবুর রহমান একসময় বাংলাদেশ রেলওয়ে ঋণদান সমবায় সমিতিতে চাকরি করতেন। অভিযোগ রয়েছে, স্বাক্ষর জালিয়াতির ঘটনায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।এ ছাড়া চট্টগ্রাম নগরীর নিমতলা উচ্চ বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে অস্থায়ীভাবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে মেকি সীলমোহর ব্যবহার, হিসাব বিকৃতকরণ ও জাল নথিপত্র ব্যবহারের মাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগে তার বিরুদ্ধে সরকার বাদী একটি মামলা করা হয় বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকও ব্যক্তিগতভাবে তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন বলে জানা যায়।ওই মামলাগুলোর একটিতে মাহবুবুর রহমান দীর্ঘ ছয় মাস কারাগারে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে এসব মামলার বিচারিক কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে।তবে, মাহবুবুর রহমানের মুঠোফোন একাধিকবার কল করেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।নিজেকে “সিনিয়র আয়কর আইনজীবী” হিসেবে পরিচয় দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০১৭ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) আয়কর পেশাজীবী (আইটিপি) হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তবে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আইনজীবী তালিকায় তার নাম পাওয়া যায়নি।এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত না হয়ে কেউ নিজেকে “অ্যাডভোকেট” বা “আইনজীবী” হিসেবে পরিচয় দিতে পারেন না। আর “সিনিয়র” বিশেষণ ব্যবহার করতে হলে নির্দিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া ও দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়।আইনজীবীরা বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি যথাযথ যোগ্যতা ছাড়া নিজেকে “সিনিয়র আয়কর আইনজীবী” হিসেবে পরিচয় দেন, তাহলে তা বিভ্রান্তিকর ও প্রতারণামূলক হতে পারে। এ ধরনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি প্রয়োজন বলেও তারা মত দেন।রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বহিরাগত ব্যক্তিদের অবাধ যাতায়াত, নথির নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

দৈনিক রুপান্তর

 

কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত