প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ মে ২০২৬
মৃত্যুকে হার মানানোর’ মিশনে ২৬ বিলিয়ন ডলারের বাজি পুতিনের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ||
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দীর্ঘদিনের একটি ব্যক্তিগত আগ্রহ এখন রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞান নীতির অন্যতম প্রধান কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। বার্ধক্যকে ধীর করা, মানবদেহের ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা এবং মানুষের আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ক্রেমলিন কয়েক বিলিয়ন ডলারের উচ্চাভিলাষী গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে এক সামরিক কুচকাওয়াজের ফাঁকে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে পুতিনের একটি অনানুষ্ঠানিক আলাপ আলোচনায় আসে। সেখানে পুতিন মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে দীর্ঘ জীবন এবং ভবিষ্যতে অমরত্বের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। তখন অনেকেই বিষয়টিকে কৌতুক বা ব্যক্তিগত কল্পনা হিসেবে দেখলেও পরবর্তী অনুসন্ধানে জানা যায়, এর পেছনে রয়েছে রুশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত একটি বিশাল বৈজ্ঞানিক কর্মসূচি।
রাশিয়ার সরকার সম্প্রতি ‘নিউ হেলথ প্রিজারভেশন টেকনোলজিস’ নামে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্পের ঘোষণা দিয়েছে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো বার্ধক্যজনিত রোগ প্রতিরোধ, কোষের বয়স বৃদ্ধি ধীর করা এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের আয়ু দীর্ঘায়িত করা।
প্রকল্পটির আওতায় বিজ্ঞানীরা জিন-থেরাপি, কৃত্রিম অঙ্গ তৈরির প্রযুক্তি, বায়োপ্রিন্টিং এবং জেনোট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের মতো অত্যাধুনিক ক্ষেত্রগুলোতে গবেষণা চালাচ্ছেন। রুশ উপবিজ্ঞানমন্ত্রী ডেনিস সেকিরিনস্কির মতে, কোষের বার্ধক্য রোধে উন্নত জিন-ভিত্তিক চিকিৎসা ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
এই প্রকল্পের অন্যতম আলোচিত অংশ হলো থ্রিডি বায়োপ্রিন্টিং প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে জীবন্ত কোষ ব্যবহার করে পরীক্ষাগারে মানুষের টিস্যু ও অঙ্গ তৈরি করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত বিশেষ জাতের শূকরের শরীরে মানুষের জন্য উপযোগী অঙ্গ তৈরি করার গবেষণাও চলছে, যাতে ভবিষ্যতে অঙ্গ সংকট দূর করা সম্ভব হয়।
রুশ বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, তারা ইতোমধ্যে পরীক্ষাগারে ইঁদুরের থাইরয়েড গ্রন্থি এবং মানুষের তরুণাস্থির নমুনা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। সরকারের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে পরীক্ষামূলক পর্যায় পেরিয়ে মানুষের শরীরে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করা।
ADVERTISEMENT
ক্রেমলিন জানিয়েছে, এই গবেষণায় দেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞান কেন্দ্র একযোগে কাজ করছে। কর্মসূচির তদারকিতে রয়েছেন পুতিনের মেয়ে মারিয়া ভোরোনৎসোভা, যিনি পেশায় একজন এন্ডোক্রিনোলজিস্ট বা হরমোন বিশেষজ্ঞ। এছাড়া কুর্চাতভ ইনস্টিটিউটের প্রধান পদার্থবিদ মিখাইল কোভালচুকও এই প্রকল্পের অন্যতম নীতিনির্ধারক।
তবে প্রকল্পটি নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে প্রশ্নও কম নয়। সমালোচকদের অভিযোগ, এখন পর্যন্ত এই গবেষণার উল্লেখযোগ্য ফলাফল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে প্রকল্পটির কার্যকারিতা ও বাস্তব সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
রাশিয়া থেকে দেশত্যাগী বায়োপ্রিন্টিং গবেষক আলেকজান্ডার ওস্ত্রভস্কি মনে করেন, আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক যাচাই ছাড়া এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা কঠিন। তার মতে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব ফলাফলের চেয়ে রাজনৈতিক প্রত্যাশাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জনসংখ্যাগত চাপ, শ্রমশক্তির সংকট এবং স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘায়ু গবেষণাকে কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখছে মস্কো। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই কর্মসূচির মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষের জীবন রক্ষা করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অবশ্য ইতিহাস বলছে, বার্ধক্য ও মৃত্যুকে জয় করার স্বপ্ন নতুন নয়। সোভিয়েত যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বহু বিজ্ঞানী মানুষের আয়ু বাড়ানোর দাবি করেছেন, কিন্তু এখনো কেউ মৃত্যুর স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি থামাতে সক্ষম হননি।
বর্তমানে ৭৩ বছর বয়সী পুতিন নিজের সুস্বাস্থ্য ও শারীরিক সক্ষমতার ভাবমূর্তি তুলে ধরতে প্রায়ই জনসমক্ষে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। তবে রাশিয়ার বাস্তবতা হলো, দেশটিতে পুরুষদের গড় আয়ু এখনও উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি মানুষের জীবনকে দীর্ঘ করতে পারে, অনেক রোগ নিরাময়ও সম্ভব হতে পারে। কিন্তু অমরত্ব অর্জনের ধারণা এখনও বিজ্ঞান বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি কল্পনার জগতে অবস্থান করছে। ফলে পুতিনের দীর্ঘায়ু প্রকল্প ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত খুলবে, নাকি এটি কেবল আরেকটি উচ্চাভিলাষী রাষ্ট্রীয় স্বপ্ন হয়ে থাকবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত